বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দুনিয়াবী ৩৭ বছর বয়স মুবারকে এবং উনার আনুষ্ঠানিক নুবুওওয়াত প্রকাশের প্রায় তিন বৎসর পূর্বে ২০শে জুমাদাল উখরা তারিখে জুমুআবার দিন ছুবহি ছাদিকের সময় তিনি যমীনে আগমন করেন। উনার বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশকালে উনার সম্মানিতা আম্মা উম্মুল মু’মিনীন সাইয়্যিদাতুনা হযরত কুবরা আলাইহাস সালাম উনার কাছে কোনো মহিলাই উপস্থিত ছিলেন না- যিনি উনার খিদমতের আঞ্জাম দিবেন। ফলে তিনি কিছুটা চিন্তিত হতে না হতেই হঠাৎ উনার হুজরা শরীফ-এ চারজন মহিলার উপস্থিতি লক্ষ্য করলেন। উক্ত মহিলাদের আগমনে নূরানী ঘর আরো নূরানী বা আলোকিত হয়ে গেলো। তিনি উনাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করে জানলেন উনারা হলেন- উম্মুল বাশার হযরত হাওওয়া আলাইহাস সালাম, হযরত আছিয়াহ আলাইহাস সালাম, হযরত মূসা আলাইহিস সালাম উনার বোন হযরত উম্মু কুলছূম আলাইহাস সালাম এবং হযরত মারইয়াম আলাইহাস সালাম। সুবহানাল্লাহ!
এ চার সম্মানিতা মহিলা আলাইহিন্নাস সালাম উনারা নিজেদের পরিচয় দিয়ে বললেন, স্বয়ং মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাদেরকে আপনার খিদমতের জন্য পাঠিয়েছেন। কাজেই আপনার চিন্তার কোনো কারণ নেই। অতঃপর এ সকল সম্মানিতা মহিলা আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের মুবারক খিদমতে কুদরতিভাবে যমীনে তাশরীফ আনেন সারা জাহানের মহিলাকুলের সাইয়্যিদাহ, খাতুনে জান্নাহ সাইয়্যিদাতুনা হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম। সুবহানাল্লাহ!
সাইয়্যিদাতুন নিসা হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম উনার আচার-আচরণ, কথা-বার্তা, চরিত্র-বৈশিষ্ট্য এবং ছূরত-সীরতের মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণরূপে নূরে মুজসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক নিদর্শনসমূহই ফুটে উঠতো। এ কারণে উনার অনন্য একটি উপাধি মুবারক হচ্ছে ‘শাবীহাতু রসূল”। জ্ঞানে-গুণে, কাজে-কর্মে, ত্যাগ-সাধনায়, কষ্ট-সহিষ্ণুতায় এবং মাধুর্যময় চরিত্র মহিমায় তিনি ছিলেন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারই মুবারক আদর্শের উজ্জ্বল প্রতীক। তিনি পিতা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং মাতা উম্মুল মু’মিনীন সাইয়্যিদাতুনা হযরত কুবরা আলাইহাস সালাম উনাদের নিকট থেকেই শিক্ষা লাভ করেন।
সাইয়্যিদাতুনা হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি ছিলেন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিতা চারজন বানাত আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের মধ্যে চতুর্থ। কিন্তু মর্যাদার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্যা। সুবহানাল্লাহ!
বদর জিহাদের পর ২য় হিজরী সনের যিলহজ্জ মাসে খুলাফায়ে রাশিদার চতুর্থ খলীফা ইমামুল আউওয়াল মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়্যিদুনা হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার সাথে উনার নিকাহ মুবারক অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে সুসম্পন্ন হয়। স্বয়ং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এ নিকাহ মুবারক-এ মোহর ধার্য করেন পাঁচশত দিরহাম অর্থাৎ একশ সোয়া একত্রিশ তোলার রূপার মূল্য। যা মহরে যাহরায়ী শরীফ বা সুন্নতী মোহর হিসেবে মশহূর।
সাইয়্যিদাতু নিসায়ি আহলিল জান্নাহ সাইয়্যিদুনা হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম উনার তিনজন ছেলে সন্তান এবং তিনজন মেয়ে সন্তান ছিলেন। বর্ণিত রয়েছে, ১৫ই শা’বান ৩য় হিজরীতে ইমামুছ ছানী মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম তিনি পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ করেন। ৪র্থ হিজরী ৫ই শা’বান মাসে ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ করেন। ৫ম হিজরীতে সাইয়্যিদাতুন নিসা হযরত যাইনাব আলাইহাস সালাম, ৬ষ্ঠ হিজরীতে সাইয়্যিদাতুন নিসা হযরত রুকাইয়া আলাইহাস সালাম, ৭ম হিজরী সনে সাইয়্যিদাতুন নিসা হযরত উম্মু কুলছূম আলাইহাস সালাম এবং ৯ম হিজরী সনে সাইয়্যিদুনা ইমাম হযরত মুহসিন আলাইহিস সালাম তিনি বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ করেন। প্রত্যেক আওলাদ উনারা পবিত্র আছর নামায পড়ার পরই বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ করেন। অতঃপর পবিত্র মাগরিব থেকে তিনি যথারীতি নামায আদায় করেন। সুবহানাল্লাহ! অর্থাৎ উনার এক ওয়াক্ত নামাযও তরক করতে হয়নি। এজন্য উনার একটি উপাধি হলো ত্বাহিরাহ। সুবহানাল্লাহ!
হিজরী ১১ সনে ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেন। উনার বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করার পরে সাইয়্যিদাতুনা হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি মাত্র ছয় মাস যমীনে অবস্থান মুবারক করেন। অতঃপর উক্ত ১১ হিজরী সনের ৩রা রমাদ্বান শরীফ ইয়াওমুল ইছনাইন (পবিত্র সোমবার শরীফ) দিনে বাদ আছর তিনি বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেন। উনার জানাযা নামায পড়ান সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহূ ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি।
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে সাইয়্যিদাতুনা হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম উনার বহু বুযুর্গীর কথা বর্ণিত হয়েছে। একবার নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের বিশেষ মজলিসে জিজ্ঞেস করলেন, একজন মহিলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় কোন বিষয়টি? জবাবে সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, একজন মহিলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় হলো, সে কোনো বেগানা পুরুষকে দেখবে না এবং কোনো বেগানা পুরুষও তাকে দেখবে না। এ জাওয়াব শুনে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ জাওয়াব আপনি কোথা থেকে পেলেন? তিনি বললেন, সাইয়্যিদাতুনা হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম উনার কাছ থেকে। তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, তিনি তো আমারই জিসিম মুবারক উনার টুকরো বা অংশ মুবারক। সুবহানাল্লাহ!
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে, ক্বিয়ামতের দিন জনৈক ঘোষক এই বলে ঘোষণা দিবেন যে, হে লোক সকল! তোমরা নিজেদের মস্তক নিচু করে দৃষ্টি অবনমিত করো। কেননা, এখন সাইয়্যিদাতু নিসায়ি আহলিল জান্নাহ হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি এই পথ দিয়ে অতিক্রম করবেন। অতঃপর হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি সত্তর হাজার ডাগর নয়না হুরসহ বিদ্যুৎ গতিতে পুলছিরাত অতিক্রম করবেন। সুবহানাল্লাহ!
সাইয়্যিদাতুনা হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি উনার পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশের পূর্বে ওসীয়ত করেছিলেন যে, উনার জানাযা যেন নিশি রাতে দেয়া হয়। এই হলো খাতুনে জান্নাহ হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম উনার তাক্বওয়া ও পরহেযগারীর নমুনা।
মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাদের মা-বোনদের সকলকে হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম উনার পূর্ণাঙ্গ অনুসারী হওয়ার তাওফীক দান করুন। (আমীন)
No comments:
Post a Comment