আরবী মাসসমূহের ষষ্ঠ মাস হচ্ছে “জুমাদাল উখরা।” ‘জুমাদা’ শব্দটি মুয়ান্নাছ (স্ত্রী লিঙ্গ) তার অর্থ ‘জমাট পানি’ বা ‘বরফ।’ সে হিসেবে তার পরে “উখরা” শব্দটিও ‘আখির’ শব্দ থেকে মুয়ান্নাছ এবং উনার অর্থ শেষ।
বিশুদ্ধ মতে, আনুষ্ঠানিক নুবুওওয়াত প্রকাশের প্রায় তিন বৎসর পূর্বে ২০শে জুমাদাল উখরা তারিখ মুসলিম জাহানের শিরোমণি খাতূনে জান্নাত সাইয়্যিদাতুন নিসা হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের দিন। তিনি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সর্বকনিষ্ঠা বানাত ছিলেন। উনার সম্মানিতা মাতা হলেন ত্বইয়িবা, ত্বাহিরা হযরত কুবরা আলাইহাস সালাম।
নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি স্বয়ং উনার এই উত্তম বানাত উনার নাম মুবারক রাখেন ‘ফাতিমা’। এটি উনার মূল নাম মুবারক। এছাড়াও আরো কয়েকটি লক্বব বা গুণবাচক নাম মুবারক-এ তিনি পরিচিত হয়ে আছেন। যেমন- সাইয়্যিদা, ত্বাহিরাহ, যাহরা, যাকিয়াহ, রদ্বিয়াহ, মারদ্বিয়াহ, উম্মু আবীহা ও বাতূল।
“সাইয়্যিদা” অর্থ শ্রেষ্ঠা। তিনি এ লক্ববে ভূষিত হয়েছিলেন এ কারণে যে, ‘তিনি দুনিয়ায় যেমন নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারিণী তেমনি বেহেশতেও হবেন নারীকুলের সাইয়্যিদা।’
“ত্বাহিরাহ”- ত্বাহিরাহ অর্থ পবিত্রা। এ লক্বব মুবারকটি বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় প্রকার পবিত্রতার সাথে সম্পর্কযুক্ত। এ লক্বব মুবারকটি দেয়ার একটা কারণ হলো এই যে, মহিলাদের সন্তান হওয়ার পর নামায তরক করতে হয়। কিন্তু উনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত। আছরের নামায পড়ার পরই উনার সম্মানিত আওলাদ মুবারক উনারা উনাদের বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ করেন। অতঃপর মাগরিব থেকে যথারীতি তিনি নামায আদায় করেন। অর্থাৎ উনার এক ওয়াক্ত নামাযও তরক হয়নি। সুবহানাল্লাহ!
“যাহ্রাহ”- অর্থ কুসুুম কলি বা ফুল। বাস্তবিক পক্ষে তিনি একটি অনুপম সুন্দর সুরভিত কুসুম কলির মতোই রূপে-গুণে সুষমাম-িত ছিলেন। সুবহানাল্লাহ!
“যাকিয়াহ”- অর্থ বুদ্ধিমতি, প্রখর মেধার অধিকারিণী। লক্বব মুবারকটি দেয়া হয়েছিল এ জন্য যে, তিনি কোনো বিষয় শোনা মাত্রই তা আয়ত্ত করে ফেলতেন। সুবহানাল্লাহ!
“রদ্বিয়াহ”- অর্থ সন্তুষ্ট। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে অবিচলভাবে তিনি ছিলেন পরিপূর্ণভাবে মহান আল্লাহ পাক উনার ইচ্ছা ও সন্তুষ্টির উপর পূর্ণ নির্ভরশীল।
“মারদ্বিয়াহ”- অর্থ সন্তুষ্টিপ্রাপ্তা। এ লক্বব মুবারকটি এজন্য যে, তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি লাভে ধন্য হয়েছিলেন।
“বাতূল”- অর্থ ভোগ- লিপ্সা বর্জনকারিণী। উনার এ লক্ববটি হয়েছিল এ কারণে যে, তিনি পার্থিব ভোগ-লিপ্সা ইত্যাদি সবকিছুই একেবারে বর্জন করেছিলেন।
উনার সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত হয়েছে, “সাইয়্যিদাতু নিসায়ি আহলিল জান্নাহ সাইয়্যিদাতুনা হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি বেহেশতবাসিনী মেয়েগণের সাইয়্যিদা হবেন।”
নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আরো বলেন, “হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি আমার জিসিম মুবারক উনার অংশ মুবারক। যে ব্যক্তি সাইয়্যিদাতু নিসায়ি আহলিল জান্নাহ সাইয়্যিদাতুনা হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম উনাকে কষ্ট দেয় সে মূলত আমাকেই কষ্ট দেয়। আর যে উনাকে শান্তি দান করে সে আমাকেই শান্তি দান করে।” এসব পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সাইয়্যিদাতু নিসায়ি আহলিল জান্নাহ সাইয়্যিদাতুনা হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম উনার মর্যাদা ও ফযীলত কত ঊর্ধ্বে।
সাইয়্যিদাতু নিসায়ি আহলিল জান্নাহ সাইয়্যিদাতুনা হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম উনার আচার-আচরণ, কথা-বার্তা, চরিত্র-বৈশিষ্ট্য এবং ছূরত-সীরত মুবারক উনার মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণভাবে হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিদর্শনসমূহই ফুটে উঠতো। জ্ঞানে-গুণে, কাজে-কর্মে, ত্যাগে-সাধনায়, কষ্ট-সহিষ্ণুতায় এবং মাধুর্যময় চরিত্র মহিমায় তিনি ছিলেন হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারই আদর্শের উজ্জ্বল প্রতীক। তিনি পিতা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এবং মাতা উম্মুল মু’মিনীন সাইয়্যিদাতুনা হযরত কুবরা আলাইহাস সালাম উনার নিকট থেকেই শিক্ষা লাভ করেন।
উনার বিবাহ মুবারক হয়েছিল খুলাফায়ে রাশিদীন উনাদের চতুর্থ খলীফা ইমামুল আউওয়াল সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার সাথে। উনার দু’ছেলে সাইয়্যিদু শাবাবি আহলিল জান্নাহ ইমামুছ ছানী সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম এবং ইমামুছ ছালিছ সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনাদের মাধ্যমেই নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্রতম বংশ মুবারক জারি রয়েছে এবং তা ক্বিয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে। উনাদের বংশধরকেই ‘সাইয়্যিদ’ বলা হয়।
অতএব, সাইয়্যিদাতু নিসায়ি আহলিল জান্নাহ সাইয়্যিদাতুনা হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি যে নারী জগতের এক বিস্ময়কর আদর্শ এবং সমগ্র নারীকুলের ঊর্ধ্বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু ইহজগতেই নয়, পরজগতেও তিনি হবেন বেহেশতবাসিনী মেয়েগণের সাইয়্যিদা।
No comments:
Post a Comment