রফীক্বে আলা মহান বারী তায়ালা উনার দায়িমী হাক্বীক্বী দীদার মুবারকে গমনের আনুষ্ঠানিকতা সমূহে পবিত্র শাহাদাত শরীফ অন্যতম। পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার ইতিহাসে অত্যাধিক মর্মান্তিক শাহাদাত উনার ঘটনার মধ্যে আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র শাহাদাত মুবারক অন্যতম। সঙ্গত কারণেই এ বিষয়ে পবিত্র হাদীছ শরীফ ও ইতিহাসে ব্যাপক আলোচনা পর্যালোচনা করা হয়েছে।
আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র খিলাফতকাল মুবারক সুদীর্ঘ বারো বছর। কিতাবে উল্লেখ করা হয়, প্রথম ছয় বছর কেবল বিজয় আর সমৃদ্ধি। কিন্তু সম্মানিত জান্নাতী এই পরিবেশ কাফিরদের সহ্য হলোনা। পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার সূচনা লগ্ন হতে চালিয়ে যাওয়া ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতাকে তারা আরো তীব্র হতে তীব্রতর করলো। সর্বতভাবে মুনাফিকদেরকে সচল করলো, পথে ঘাটে লেলিয়ে দিলো। ইহুদী বংশোদ্ভূত ইবনে সাবার নেতৃত্বাধীন মুনাফিকরা দ্বিতীয় ছয় বছরকে বিষাদময় করে তোলার জন্য অপচেষ্টা শুরু করল। তাদের এই ষড়যন্ত্রকে যখন কোনভাবেই সফল করতে পারল না, তখন তারা স্বয়ং ‘খলীফাতুল মুসলিমীন’ উনাকে নিশানা বানায়। এই কাফিররা পূত পবিত্র মদীনা শরীফ উনাকে রক্তে রঞ্জিত করতে চায়। কিন্তু মহাসম্মানিত খলীফাতুল মুসলিমীন তিনি পবিত্র মদীনা শরীফ উনার ইজ্জত রহমত রক্ষার ব্যাপারে অটল অবিচল। প্রয়োজনে পবিত্র শাহাদাত উনার শারাবান তহুরা পান করবেন, কিন্তু পবিত্র মদীনা শরীফ উনার হুরমতকে বিঘিœত করতে দিবেন না।
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করা হয়,
عَنْ حَضْرَتْ اَبِـىْ سَهْلَةَ رَضِىَ اللهُ تَعَالـى عَنْهُ اَنَّ حَضْرَتْ عُـثْمَانَ عَلَيْهِ السَّلَامُ قَالَ يَوْمَ الدَّارِ حِـيْـنَ حُصِرَ اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَهِدَ اِلَـىَّ عَهْدًا فَاَنَا صَابِرٌ عَلَيْهِ
অর্থ: হযরত আবু সাহলা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনাকে যেদিন গৃহবন্দি করা হলো, সেদিন তিনি বললেন, নিশ্চয়ই নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আমার কাছ থেকে একটি বিষয়ে ওয়াদা মুবারক নিয়েছেন। কাজেই, আমি এ বিষয়ে ধৈর্যধারণ করবো। (মুসনাদে আহমদ)
আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনাকে উনার পবিত্র হুজরা শরীফে মুনাফিকরা অবরোধ করলো। পবিত্র মদীনা শরীফ উনার হুরমত বিঘ্নিত হবে এই আশংকায় পবিত্র মদীনা শরীফে তাদেরকে শাস্তি দিতে তিনি বারণ করলেন। মুনাফিকরা খিলাফতের দায়িত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার অমূলক প্রস্তাবনা দিলো। এখানেও তিনি ছবর করলেন। পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,
عَنْ حَضْرَتْ عَائِشَةَ عليها السلام قَالَتْ سَمِعْتُ رسول الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يقول لعثمان عَلَيْهِ السَّلَامُ: إِنَّ اللَّهَ مُقَمِّصُكَ قَمِيصًا فَإِنْ أَرَادَ الْمُنَافِقُونَ خَلْعه فَلا تَخْلَعْهُ حَتَّى تَلْقَانِي
অর্থ: উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছা হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনাকে সম্বোধন করে বলেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি আপনাকে একখানা জামা মুবারক পরিধান করাবেন। মুনাফিকরা যদি তা খুলে নিতে চায়, তাহলে আমার সাক্ষাত মুবারকে মিলিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আপনি তা খুলবেননা। (ইবনু মাজাহ শরীফ)
অর্থাৎ, হে হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম! মহান আল্লাহ পাক তিনি খিলাফতের মহান দায়িত্ব আপনাকে অর্পন করবেন। মুনাফিকরা আপনার সেই মহান দায়িত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা করবে। আপনি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহু হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দীদার মুবারকে গমন করার পূর্বে খিলাফতের মহান দায়িত্ব হস্তচ্যুত করবেন না। সত্যিই সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম তিনি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দীদার মুবারক গ্রহণ করার পূর্বে খিলাফতের দায়িত্ব হস্তচ্যূত করেননি।
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,
عَنْ حَضْرَتْ ابن الصلت رَضِىَ اللهُ تَعَالـى عَنْهُ قال أغفى عثمان بن عفان عَلَيْهِ السَّلَامُ في اليوم الذي قتل فيه فاستيقظ فقال لولا أن يقول الناس تمنى عثمان عَلَيْهِ السَّلَامُ أمنية لحدثتكم.قال قلنا أصلحك الله، حدثنا فلسنا نقول ما يقول الناس.فقال: إني رأيت رسول الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ في منامي هذا فقال: إنك شاهد معنا الجمعة.
অর্থ: হযরত ইবনুছ ছলত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম তিনি খিলাফতের মহান দায়িত্ব হতে সেই দিন অব্যহতি পেলেন, যেদিন তিনি পবিত্র শাহাদাত মুবারক গ্রহণ করেন। তিনি ঘুম মুবারক হতে জাগ্রত হয়ে ইরশাদ মুবারক করলেন, আমি ফিৎনা কামনা করছি এই অপবাদ যদি আমার উপর আরোপ করা না হতো, তাহলে আমি তোমাদের নিকট একটি বিষয় বর্ণনা করতাম। রাবী বলেন, আমরা বললাম, আমাদেরকে বলুন, আমরা মুনাফিকদের ন্যায় আপনার উপর অপবাদ দিবোনা। তখন তিনি ইরশাদ মুবারক করলেন, ঘুমের মধ্যে আমি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিশেষ সাক্ষাৎ মুবারক লাভ করলাম। তিনি আমাকে সম্বোধন করে ইরশাদ মুবারক করলেন, “নিশ্চয়ই আপনি জুমুয়াতে আমাদের সাথে মিলিত হবেন। (কানযুল উম্মাল)
অন্য হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,
عَنْ حَضْرَتْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ سَلَامٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالـى عَنْهُ قَالَ أَتَيْتُ عُثْمَانَ عَلَيْهِ السَّلَامُ وَهُوَ مَحْصُورٌ أُسَلِّمُ عَلَيْهِ ، فَقَالَ : مَرْحَبًا بِأَخِي ، مَرْحَبًا بِأَخِي ، مَا يَسُرُّنِي أَنَّكَ وَرَاءَكَ ، أَلَا أُحَدِّثُكَ مَا رَأَيْتُ اللَّيْلَةَ فِي الْمَنَامِ ؟ قُلْتُ : بَلَى ، قَالَ : رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي هَذِهِ الْخَوْخَةِ ، وَإِذَا خَوْخَةٌ فِي الْبَيْتِ ، فَقَالَ : حَصَرُوكَ ؟ قُلْتُ : نَعَمْ ، قَالَ : أَعْطَشُوكَ ؟ قُلْتُ : نَعَمْ ، قَالَ : فَأَدْلَى لِي دَلْوًا مِنْ مَاءٍ ، فَشَرِبْتُ مِنْهُ حَتَّى رَوِيتُ ، فَإِنِّي لَأَجِدُ بَرْدَهُ بَيْنَ كَتِفَيَّ وَبَيْنَ ثَدْيَيَّ ، قَالَ : إِنْ شِئْتَ نُصِرْتَ عَلَيْهِمْ ، وَإِنْ شِئْتَ أَفْطَرْتَ عِنْدَنَا ، فَاخْتَرْتُ أَنْ أُفْطِرَ عِنْدَهُ ، قَالَ : فَقُتِلَ فِي ذَلِكَ الْيَوْمِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ .
অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনাকে উনার পবিত্র হুজরা শরীফ উনার মধ্যে অবরুদ্ধ করা হলে তিনি উনার মুবারক খিদমতে উপস্থিত হয়ে উনাকে সালাম দিলেন। জবাবে তিনি বললেন, আমার ভাইকে স্বাগতম, আমার ভাইকে স্বাগতম। আমাকে কতই না আনন্দ দিচ্ছে যে আপনি আমার পরে জমীনে অবস্থান মুবারক করবেন। আমি এই রাতে মুবারক স্বপ্নে যা দেখেছি, তা কি আপনাকে বলবোনা? হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বললেন, অবশ্যই আপনি বলুন, হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম তিনি হুজরা শরীফ উনার একখানা জানালা মুবারক দেখিয়ে ইরশাদ মুবারক করেন, এই জানালায় আমি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহু হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে দেখতে পেলাম। তিনি বললেন, তারা আপনাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে? আমি বললাম, জ্বী। তিনি বললেন, তারা আপনাকে পিপাসার্ত রেখেছে? আমি বললাম জ্বী। অতঃপর তিনি আমার নিকট এক বালতি পানি পাঠালেন; আমি তৃপ্ত হওয়া পর্যন্ত পানি পান করলাম। আমি পানের শীতলতা আমার দু’স্তন মুবারকের মাঝে অনুভব করলাম। তিনি বললেন, আপনি যদি ইচ্ছা করেন, তাহলে আপনি আজ আমার সাথে ইফতারী করতে পারবেন। আর যদি আপনি জিহাদ করতে চান, তাহলে মহান আল্লাহ পাক তিনি আপনাকে বিজয় দান করবেন। আমি বললাম, বরং আমি আপনার সাথে ইফতার করবো। ফলে তিনি ঐ দিনই পবিত্র শাহাদাত মুবারক গ্রহণ করেন। (ইবনু আসাকির)
পবিত্র জুমুয়ার দিন জুমুয়ার ওয়াক্তে সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আ্যলাইহিস সালাম তিনি শাহাদাত মুবারক গ্রহণ করেন। উনার পবিত্র শাহাদাতের সাথে জড়িত সকলের উপর কিয়ামত পর্যন্ত মহান আল্লাহ পাক উনার লা’নত। পবিত্র হাদীছ শরীফে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,
عن حَضْرَتْ جابر رَضِىَ اللهُ تَعَالـى عَنْهُ قال أتي رسول الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِجَنَازَةِ رَجُلٍ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيْهِ فقالوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا رَأَيْنَاكَ تَرَكْتَ الصَّلَاةَ عَلَى أَحَدٍ قَبْلَ هَذَا؟ قَالَ إِنَّهُ كَانَ يَبْغَضُ عُثْمَانَ عَلَيْهِ السَّلَامُ أَبْغَضَهُ اللَّهُ
অর্থ: হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক খিদমতে জানাযার জন্য জন্য এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হলো। কিন্তু তিনি তার জানাযা আদায় করলেন না। তখন হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা আরজ করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এ ব্যক্তির জানাযা ব্যতীত অন্য কারো জানাযা আপনাকে তরক করতে দেখিনি। তখন তিনি ইরশাদ মুবারক করলেন, এ ব্যক্তি হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতো। তাই, মহান আল্লাহ পাকও তাকে অপছন্দ করেন। (তারিখে দামেশ্ক)
পবিত্র হাদীছ শরীফে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছা হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন,
فمن سب عثمان عَلَيْهِ السَّلَامُ فعليه لعنة الله
অর্থ: সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনাকে যে গালি দিবে বা উনার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে, তার উপর মহান আল্লাহ পাক উনার লা’নত। (মু’জামুল আওছাত)
মূলকথা হলো, সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার ইতিহাসে সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাত মুবারক সবচেয়ে মমান্তিক ঘটনা। তবে এ ঘটনায় অনেক ইবরত রয়েছে। সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম তিনি উনার সমস্ত কিছু কুরবানী করে দিয়ে পবিত্র মদীনা শরীফ উনার হুরমত রক্ষা করলেন। আর তিনি সাবিকভাবে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহু হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দ্বারা পরিচালিত। কাজেই, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উনার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীদের প্রতি অনন্তকালের জন্য লা’নত।
No comments:
Post a Comment